তিন বৃহত্তম অংশীদারের পণ্যে শুল্ক

বাণিজ্যযুদ্ধ উসকে দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, আর্থিক বাজারে আশঙ্কা

অভিধানের সবচেয়ে সুন্দর শব্দ হিসেবে ‘শুল্কের’ উল্লেখ করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তা নির্বাচনী প্রচারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এবার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কানাডা, মেক্সিকো ও চীনের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপ করলেন তিনি।

অভিধানের সবচেয়ে সুন্দর শব্দ হিসেবে ‘শুল্কের’ উল্লেখ করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তা নির্বাচনী প্রচারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এবার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কানাডা, মেক্সিকো ও চীনের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপ করলেন তিনি। এর মাধ্যমে তিন বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যযুদ্ধের সূচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্যে দেশ তিনটি পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পুরো বিষয়টি আর্থিক বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে বলে মত বিশ্লেষকদের। খবর এফটি ও রয়টার্স।

ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার নির্বাহী আদেশে কানাডা ও মেক্সিকো থেকে আমদানীকৃত সব পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছেন। তবে কানাডার জ্বালানি তেল ও জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ১০ শতাংশ হবে। যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল সরবরাহকারী কানাডা, যা দেশটির মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেয়। এছাড়া চীন থেকে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর বিদ্যমান শুল্কের পাশাপাশি আরো ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ব্যবহার করেছেন, যা তাকে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই জরুরি পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেয়ার অনুমতি দেয়। এ আইন আগে শুল্ক আরোপের জন্য ব্যবহার করা হয়নি। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৯ সালে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে এটি প্রয়োগের হুমকি দিয়েছিলেন।

নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রুথ সোশ্যালে এ রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জানান, শুল্ক আরোপের জন্য জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন তিনি। কারণ কানাডা ও মেক্সিকোর অবৈধ অভিবাসী এবং চীনের মারণঘাতী ফেন্টানাইল মাদকের হুমকিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, আগামী মঙ্গলবার থেকে এ শুল্ক কার্যকর হবে। এক মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিটি আদেশের মধ্যে প্রতিশোধমূলক ধারা রয়েছে। এর অর্থ হলো, যদি কোনো দেশ প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আরো কঠোর শুল্ক আরোপের মাধ্যমে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।’

ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের প্রতিক্রিয়ায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা ১০ হাজার ৭০০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এর মধ্যে মার্কিন অ্যালকোহল, পোশাক, গৃহস্থালি সামগ্রী ও কাঠ অন্তর্ভুক্ত।

জাস্টিন ট্রুডো বলেন, ‘এ শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজারে প্রভাব ফেলবে এবং সম্ভবত মার্কিন গাড়ি সংযোজন কারখানা ও অন্যান্য উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাবে। এটি খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেবে।’

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউম পাল্টা শুল্ক আরোপের পাশাপাশি অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন। মাইক্রো ব্লগিং প্লাটফর্ম এক্সে তিনি লেখেন, ‘শুল্ক আরোপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হয় না, বরং আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে হয়।’

এছাড়া গতকাল চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা ও বিরোধিতা করে জানিয়েছে, নিজেদের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় পাল্টা ব্যবস্থা নেবে বেইজিং।

তারা আরো বলেছে, শুল্ক আরোপে ফেন্টানাইল ইস্যুকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু মাদকের বিরুদ্ধে বিশ্বে সবচেয়ে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকারী দেশের অন্যতম চীন।

বাড়তি শুল্ক বিষয়ে চীনের পিনপয়েন্ট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ ঝিওয়েই ঝাং বলেন, ‘১০ শতাংশ শুল্ক চীনের অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা নয় এবং এটি চীনের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে কোনো পরিবর্তন আনবে না।’

বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ ও অর্থনীতিবিদরা ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। মার্কিন চেম্বার অব কমার্স সতর্ক করেছে, এ শুল্ক মার্কিন গৃহস্থালি পর্যায়ে ব্যয় বাড়াবে এবং সরবরাহ চেইন ব্যাহত করবে।

মার্কিন বৃহত্তম জীবাশ্ম জ্বালানি লবি গ্রুপ আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউট সতর্ক করেছে, উত্তর আমেরিকার জ্বালানি বাজার পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত এবং মুক্ত বাণিজ্য অপরিহার্য।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা বিভাগের অধ্যাপক দিমিত্রি আনাস্তাকিসের মতে, এ শুল্ক কভিড মহামারীর মতোই অর্থনীতিতে ধাক্কা দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘এটি অপ্রয়োজনীয় ও একেবারেই বোকামি। এটি উত্তর আমেরিকার অর্থনীতিতে একটি অপ্রয়োজনীয় সমস্যা তৈরি করছে।’

তিনি বলেন, ‘‌গাড়ি বাণিজ্যে তাৎক্ষণিক ধাক্কা লাগবে, চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে এবং কানাডায় মন্দা দেখা দিতে পারে।’

এর আগে শুক্রবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিলেও পরদিন ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণায় এটি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এছাড়া চীনের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারে ৬০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিলেও তা ১০ শতাংশে সীমিত রেখেছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ ঘোষণায় শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুসারে, কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর এ শুল্কের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি দশমিক ৭ শতাংশ বাড়বে এবং জিডিপি দশমিক ৮ শতাংশ কমবে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন। কারণ এটি ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার কমানোর পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সিটেরা ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা জিন গোল্ডম্যান বলেছেন, ‘উচ্চ মূল্যায়ন, শুল্কের প্রভাব ও ফেডের নীতির কারণে শেয়ারবাজারে পতন দেখা যেতে পারে।’

এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক সর্বোচ্চ স্তরের কাছাকাছি রয়েছে এবং বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, বাজার ৩-৫ শতাংশ পর্যন্ত ওঠানামা করতে পারে।

আরও